অতুলপ্রসাদ সেন এর কবিতা সংগ্রহ

Atul Prasd Sen

অতুলপ্রসাদ সেন

  • অতুলপ্রসাদ সেন ছিলেন ব্রিটিশ ভারবর্ষে ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট বাঙালি গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। বিশিষ্ট সংগীতবিদ অতুলপ্রসাদ সেন বাংলা গানে ঠুংরি ধারার প্রবর্তক। তিনিই প্রথম বাংলায় গজল রচনা করেন। বাংলা সঙ্গীতের প্রধান পাঁচজন স্থপতির একজন অতুলপ্রসাদ সেন। ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সঙ্গীতজ্ঞ অতুলপ্রসাদকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায়। উল্লেখ্য যে, অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকায় তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর রচিত গানগুলির মূল উপজীব্য বিষয় ছিল দেশপ্রেম, ভক্তি ও প্রেম। তাঁর জীবনের দুঃখ ও যন্ত্রণাগুলি তাঁর গানের ভাষায় বাঙ্ময় মূর্তি ধারণ করেছিল; “বেদনা অতুলপ্রসাদের গানের প্রধান অবলম্বন”। তাঁর বিখ্যাত ‘মোদের গরব, মোদের আশা/ আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটিতে অতুলপ্রসাদের মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে। এ গান বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের মধ্যে অফুরন্ত প্রেরণা জুগিয়েছে। গানটির আবেদন আজও অম্লান। মনে পড়ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দিনগুলোতে কেন্দ্রের মিউজিক লাইব্রেরিতে এল.পি রেকর্ডে কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে অতুলপ্রসাদ সেনের গান শুনে শুনে তাঁর প্রতি আগ্রহ বাড়ে, যতই তাঁর গান শুনি, ততই মুগ্ধ হই। সেই বিস্ময়ের ঘোর আমার আজও কাটেনি। অতুলপ্রসাদ সেনের কয়েকটি বিখ্যাত গান হল “মিছে তুই ভাবিস মন”, “সবারে বাস রে ভালো”, “বঁধুয়া, নিঁদ নাহি আঁখিপাতে”, “একা মোর গানের তরী”, “কে আবার বাজায় বাঁশি”, “ক্রন্দসী পথচারিণী” ইত্যাদি। তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গানগুলির মধ্যে প্রসিদ্ধ “উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী”, “বলো বলো বলো সবে”, “হও ধরমেতে ধীর”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সব গানের বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। “অতুলপ্রসাদী গান” নামে পরিচিত এই ধারার একজন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়।

    ২.
    উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রপ্রতিভার প্রভাব বলয়ের মধ্যে বিচরণ করেও যাঁরা বাংলা কাব্যগীতি রচনায় নিজেদের বিশেষত্ব প্রকাশ করতে সক্ষম হন, অতুলপ্রসাদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। সমকালীন গীতিকারদের তুলনায় অতুলপ্রসাদের সঙ্গীতসংখ্যা সীমিত হলেও তাঁর অনেক গানে সাঙ্গীতিক মৌলিকত্ব পরিলক্ষিত হয়; আর সে কারণেই তিনি বাংলা সঙ্গীত-জগতে এক স্বতন্ত্র আসন লাভ করেন। তাঁর গানগুলি অতুলপ্রসাদের গান নামে প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলাভাষীদের নিকট অতুলপ্রসাদ সেন (জন্ম : ২০ অক্টোবর, ১৮৭১- মৃত্যু : ২৬ আগস্ট, ১৯৩৪) প্রধানত একজন সঙ্গীতজ্ঞ ও সুরকার হিসেবেই পরিচিত। তাঁর গানগুলি প্রধানত স্বদেশীসঙ্গীত, ভক্তিগীতি ও প্রেমের গান এ তিন ধারায় বিভক্ত। তবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের বেদনা সকল ধরণের গানেই কম-বেশি প্রভাব ফেলেছে। এজন্য তাঁর অধিকাংশ গানই হয়ে উঠেছে করুণরস-প্রধান। অতুলপ্রসাদের গজলের সংখ্যা মাত্র ৬-৭টি হলেও তিনিই বাংলা ভাষায় প্রথম গজল রচয়িতা। সমালোচকদের মতে, গজল রচনায় নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬)-এর মতো তিনি সুরের নানাবিধ অলঙ্কারিক ক্রিয়ায় সুরের বিশ্লেষণে, সুরের কারুকাজে, গীতের গুণে, স্বরের রসভাবে, বাদ্যের অনুরণনে এবং কথা ও সুরের সমন্বয়ে স্বাতন্ত্র্য-ধারা সৃষ্টির মতো প্রাবল্য আনতে পারেনি।

    ৩.
    ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
    তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!
    কি যাদু বাংলা গানে!- গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে
    এমন কোথা আর আছে গো!
    গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।।’
    রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষে ১৯১৩ সালে লেখা এই গানটিতে তিনি বাঙালি এবং বাংলা ভাষার প্রতি গভীর প্রেম ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।এই মাতৃভাষাপ্রেমপূর্ণ সঙ্গীতটি বাঙালির প্রাণে আজও ভাষাপ্রেমে গভীর উদ্দীপনা সঞ্চার করে। কী সহজ শব্দ, কী সরল ব্যঞ্জণা-অথচ কী অপূর্ব স্বদেশের প্রতি, মায়ের ভাষার প্রতি ঐকান্তিক মমত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে। এই সঙ্গীতটির রচয়িতার নাম অতুলপ্রসাদ সেন। কবি, সুরকার এবং সঙ্গীতজ্ঞ অতুল প্রসাদ সেন স্বজাতি বলতেও বাংলা মায়ের সর্ব ধর্মের সন্তানকে বুঝিয়েছেন। একটি গানে বলেছেন “দেখ মা এবার দুয়ার খুলে/ গলে গলে এলো মা/ তোর হিন্দু-মুসলমান দুই ছেলে”। কবির স্বদেশি সঙ্গীতগুলো বিশেষত ‘মোদের গরব, মোদের আশা’ এই গানটি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে অসীম প্রেরণা যুগিয়েছে। আমরা জানি, ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিনে, জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করা হয়। এই দিনে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে– হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধনের প্রতীক হিসাবে ‘রাখিবন্ধন’-এর ব্যবস্থা করা হয়। অতুলপ্রসাদ এই অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতায় আসেন এবং ‘রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। লখ্‌নৌতে ফিরে এসে তিনি স্বদেশী চেতনায় ভারতীয় যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য, ‘মুষ্ঠিভিক্ষা সংগ্রহ’-এর সূচনা করেন। পরে এই সূত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আউধ সেবাসমিতি’। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘খামখেয়ালী সভা’র সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। এই আসর হাস্যরসাত্মক গান ছাড়াও রাগসঙ্গীতের মতো উচ্চাঙ্গের গান হতো। আসরে রাগসঙ্গীত পরিবেশন করতেন রাধিকা গোস্বামী এবং এর সাথে তবলায় সঙ্গত করতেন নাটোরের মহারাজ, আর এস্রাজ বাজাতেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বিলেত ফেরত অতুলপ্রসাদ কোলকাতার উচ্চবর্গের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। শিল্প ও সৃজন জগতের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে ‘খামখেয়ালী সভা’র সদস্য হওয়ার সুবাদে। এই সংগঠনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, লোকেন পালিত (?), উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫), রাধিকামোহন গোস্বামী (১৮৬৩-১৯২৫) প্রমুখ সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবীদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের দুর্লভ-সান্নিধ্যের বাঞ্ছিত সুযোগ পেয়েও সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নিজেকে তেমনভাবে গড়ে তুলতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের গান অসম্ভব ভালবাসতেন কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন সে গানের বাণী ও সুরের মৌলিকতা অনুধাবন করতে। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ হিমালয় ভ্রমণের পর রামগড় এলে, তিনি অতুলপ্রসাদকে আমন্ত্রণ জানান। অতুলপ্রসাদ রামগড়ে গিয়ে কিছুদিন কাটান।

    ৪.
    অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র অতুলপ্রসাদ লেখাপড়ার পাশাপাশি অল্প বয়সেই সঙ্গীত চর্চায় মনোযোগী হন। তিনি ব্যারিস্টারি পেশার মধ্যে পাননি অন্তরের আনন্দ তাই তেমন ভাবে ওতে মন বসাতে পারেননি। তাঁর মনের ভেতরে ঝর্ণা ধারার মতোন নিত্য বহমান ছিলো সুরের মূর্ছনা, কবিতার গুঞ্জণ। ‘ভক্তিরসের সাধক’ অতুলপ্রসাদের এই ভক্তিরস স্বদেশ-স্বজাতি-স্বভাষার প্রতি ভক্তি। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, বাউল, কীর্তন, ঠুমরি, রাগপ্রধান সব ধরণের সুর, তাল, লয়ের সমন্বয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সঙ্গীতের সাধনা করেছেন আজীবন। সমকালীন গীতিকারদের তুলনায় সীমিত সংখ্যক সঙ্গীত রচনা করেও বাংলা গানের জগতে অতুলপ্রসাদ একটি নিজস্ব আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন তাই। তাঁর সঙ্গীত ‘অতুল প্রসাদের গান’ বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা বহু নয়, দু’শর কিছু বেশি; কিন্তু তাদের সুর ও ভাব-বৈশিষ্ট্যে তিনি আধুনিক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। পরাধীনতার বেদনায় রচিত তাঁর গান ‘উঠো গো ভারতলক্ষ্মী’, ‘বল বল বল সবে শতবীণা বেণুরবে’, ‘হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর’ প্রভৃতির জনপ্রিয়তা স্বাধীন ভারতেও অক্ষুণ্ণ আছে। তাঁর ভগবতসংগীত, প্রকৃতি ও প্রেম-গাথা, সর্বত্রই যে গভীর বেদনার মধ্যেই ভক্তি ও প্রেমাস্পদের প্রতি একান্ত আত্মনিবেদন ও নির্ভর- কথার ঋজুতায় ও সুরের বৈচিত্রে মূর্ত হয়েছে। তার ফলে তাঁর রচিত গান দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি শ্রোতার মর্মস্পর্শী হয়ে আছে। বাংলা কাব্যগীতির বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ না করে তিনি তাঁতে হিন্দুস্থানী সংগীতের সুরবিশিষ্ট ঢঙের সার্থক যোগসাধন করেছেন; বাউল ও কীর্তনের সুরের যোগসাধন করে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে হিন্দুস্থানী ঢঙের সংযোজন করে তিনি বাংলা গানে বৈচিত্র্যের সঞ্চার করেছেন। তাঁর গানগুলি ‘গীতিগুঞ্জ’ (১৯৩১ খ্রী.) গ্রন্থে সংকলিত হয়; তার আগে ‘কয়েকটি গান’ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘কাকলি’ গ্রন্থমালায় এইসব গানের স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর এ সকল গানেই এক অনির্বচনীয় ভক্তি রস এবং নির্মল আনন্দের উৎস রয়েছে। যেমন ঠুমরি ও দাদরা ভঙ্গির গান-‘কি আর চাহিব বলো’ কিংবা ‘ওগো নিঠুর দরদী/ একি খেলছ অনুক্ষণ’ প্রভৃতি গানের করুণ রসের মাধুর্য অনাবিল আনন্দে শ্রোতার হৃদয় পূর্ণ করে।

    ৫.
    আগেই জেনেছি, পঞ্চকবির অন্যতম একজন অতুলপ্রসাদ সেনের মৃত্যু হয় ১৯৩৪ সালে লক্ষ্ণৌয়ে। ১৯৩৪ সালের ১৫ এপ্রিলে পুরী যান অতুলপ্রসাদ সেন। মহাত্মা গান্ধী এই সময় পুরীতে আসেন। গান্ধীজীর অনুরোধে অতুলপ্রসাদ তাঁকে গান গেয়ে শোনান। আর সে বছরের ২৫ আগস্ট তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৬ আগস্ট দিবাগত রাতে মৃত্যুবরণ করেন। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধি আছে ঢাকার অদূরবর্তী গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে কাওরাইদ সুতিয়া নদীর তীরে। নদীর এক তীরে গাজীপুরের শ্রীপুর, অন্য তীরে ময়মনসিংহের গফরগাঁও। শ্রীপুরের কাওরাইদ ইউনিয়নের কাওরাইদ গ্রামেই ছিল ভাওয়ালের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছারিবাড়ি। এখানেই কালীনারায়ণ গুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি ব্রাহ্মমন্দির। এই ব্রাহ্মমন্দির লাগোয়া সমাধিতে শুধু অতুলপ্রসাদের নয়, রয়েছে তাঁর দাদামশাই কালীনারায়ণ ও মামা কেজি গুপ্ত নামে সমধিক পরিচিত স্যার কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের সমাধিও। এই কালীনারায়ণের নামেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া হয় কালীনারায়ণ বৃত্তি। বৃত্তিটা কালে কালে এর অর্থমূল্যের কারণে আকর্ষণ হারালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মলগ্নে এই বৃত্তির মূল্য ছিল অনেক। কেজি গুপ্ত ছিলেন প্রথম ভারতীয় প্রিভি কাউন্সিলর ও পূর্ববঙ্গ থেকে প্রথম আইসিএস। এই কালীনারায়ণের কন্যা হেমন্তশশীর পুত্র ছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর কালীনারায়ণের ঢাকার বাড়িতে অতুলপ্রসাদের জন্ম। যদিও তাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল দক্ষিণ বিক্রমপুরের মাগর-ফরিদপুর গ্রামে। এ গ্রামটি বর্তমানে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায় অবস্থিত এবং এখন সেখানকার মানুষ গ্রামটিকে আর মাগর-ফরিদপুর নয়, মগর বলে ডাকে।

    ৬.
    অতুলপ্রসাদের বাবার নাম রামপ্রসাদ সেন। অতুলপ্রসাদ তেরো বছর বয়সে পিতৃহারা হয়ে মা-বোনসহ মাতামহের আশ্রয়ে চলে যান। ব্রাহ্মসন্তান বলে পিতৃভূমি হিন্দুপরিবার ও গ্রামীণ সমাজ তাঁকে কাছে ডাকেনি। অতুলপ্রসাদের বাবা রামপ্রসাদ সেন মারা যাওয়ার পর, বছর ছয়েক মা হেমন্তশশী তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকতেন। ১৮৯০ সালে ছেলেমেয়েদের রেখে হেমন্তশশী কিছু সময়ের জন্য গিয়েছিলেন বড় ভাই কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের কাছে। কয়েক দিন পর হঠাৎ প্রকাশ পেল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জেঠা ও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর শ্বশুর সমাজসংস্কারক দুর্গামোহন দাশের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে হেমন্তশশীর। বিয়েটা হয় অত্যন্ত গোপনে। আর এ ঘটনায় ঘটে যায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। বাংলায় ততদিনে সতীদাহ প্রথা রদ ও বিধবা বিয়ের প্রচলন আন্দোলনে রূপ পেলেও চারদিকে এ বিয়ের খবর বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। গভীর আঘাত পান অতুলপ্রসাদও। যৌবনে অতুলপ্রসাদও মামাতো বোনের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের মধ্য দিয়ে একই রকমের আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। ১৮৮২ সালে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেত যান অতুলপ্রসাদ। কিছু পরেই সপরিবারে বিলেতে আসেন তার বড় মামা কেজি গুপ্ত। এই সময় কেজি গুপ্তের মেয়ে, নিজের মামাতো বোন হেমকুসুমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে অতুলপ্রসাদের। হেমকুসুমের গানে, বেহালা-পিয়ানো বাজানোর হাতে মুগ্ধ হন অতুলপ্রসাদ। শুরু হয় তাদের প্রেম। বিলেত থেকে ফিরে আসার পর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন তারা। প্রবল অশান্তি শুরু হয় পরিবারে। অতুলপ্রসাদের মা হেমন্তশশীও এই বিয়ের বিরোধিতা করেন। এ কথাও শোনা যায়, অতুলপ্রসাদের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কোথাও হয়তো কাজ করেছিল মায়ের প্রতি পুরনো অভিমান। তাই সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ সম্পর্ক গড়ে প্রতিশোধ নেন তিনি। কিন্তু বিয়ে হবে কী করে? আইনে তো এমন বিয়ে স্বীকৃত নয়। সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের পরামর্শে অতুলপ্রসাদ পাড়ি দিলেন স্কটল্যান্ডের গ্রেটনা গ্রিন গ্রামে। সেখানকার রীতিতে ১৯০০ সালে বিয়ে করেন অতুলপ্রসাদ ও হেমকুসুম। অতুলপ্রসাদের মামা থেকে শ্বশুর হয়ে গেলেন স্যার কেজি গুপ্ত। এ ঘটনার অভিঘাত ছিল বহুদূর।অপরদিকে বিলেতে আইন ব্যবসাও জমাতে ব্যর্থ হন অতুলপ্রসাদ ।এরই মধ্যে ১৯০১ সালে তাদের যমজ পুত্রসন্তানের জন্ম হলে তাদের নাম রাখা হয় দিলীপকুমার ও নিলীপকুমার। এই সময় তিনি প্রচণ্ড আর্থিক কষ্টের ভিতর পড়েন।সংসারের খরচ মেটানোর এক সময় হেমকুসুম গহনা বিক্রয় শুরু করেন। এর ভিতর নিলীপকুমার সাত মাস বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। চরম হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি দেশ ফেরার কথা ভাবতে থাকেন। বিলেতে পসার জমাতে ব্যর্থ হয়ে এক সন্তান নিলীপকুমারের মৃত্যুর পর ১৯০২ সালে যখন আরেক সন্তান দিলীপকুমারকে নিয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় তারা কলকাতায় ফিরে এলেন, তখন প্রকাশ্যে একজন আত্মীয়ও তাঁদের পাশে দাঁড়াননি। এই সময় মমতাজ হোসেন নামক এক বন্ধু তাঁকে উত্তরপ্রদেশের লক্ষ্মৌতে আইন ব্যবসার পরামর্শ দেন। এই ভরসায় ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রথমে কলকাতায় ফিরে আসেন। কলকাতায় তাঁর আত্মীয়-স্বজনেরা তাঁকে বর্জন করলে, এরপর ব্যথিতচিত্তে সপরিবারে লক্ষ্মৌতে চলে যান অতুলপ্রসাদ। মমতাজ হোসেন তাঁদের জন্য রাজা শ্রীপাল সিংহের বাসা মাসিক ৩০ টাকা ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন। এখানে তিনি মমতাজ হোসেনের সহায়তায় লক্ষ্মৌতে পরিচিত হয়ে উঠেন এবং উর্দু ভাষা শেখেন। তখনকার সরকারি উকিল টমাস, নগেন্দ্র ঘোষাল ও ঝাউলালপুলের বিপিনবিহারী বসুর সহযোগিতায় নিজেকে প্রথম শ্রেণীর আইনজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। সেখানেই তাঁর আইন ব্যবসায় পসার জমে ওঠে। আবার একইসাথে অতুলপ্রসাদের সঙ্গীত জীবনেও এই পর্বটি সবচেয়ে সমৃদ্ধ। অবশ্য পারিবারিক জীবনে সুখ আসেনি তাঁর। নানা কারণে প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে এখানে এসেই সীমাহীন দূরত্ব তৈরি হয়। অতুলপ্রসাদ এবং হেমকুসুম একে অপরকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন কিন্তু তাঁদের দাম্পত্যজীবন কখনো সুখের হয়নি। অতুলপ্রসাদ ছিলেন একজন মজলিশি, সহজ, সরল, লাজুক ও দুর্বলচিত্তের সাধারণ মানুষ। কিন্তু অভিজাত বাড়ির সচ্ছল পরিবেশে লালিত হেমকুসুম ছিলেন অসম্ভব জেদী ও একরোখা। কাজেই অসম স্বভাবের দুটি তরুণ-তরুণী যে হৃদয়-সম্পর্কে আবদ্ধ হন তাতে বিবেচনার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল ক্ষণিক উচ্ছ্বাস ও স্বেচ্ছাচারী মনোভাব। দাম্পত্যজীবনের ছোটখাটো ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি, বিরহ প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য বাড়তে বাড়তে চরম আকার ধারণ করে। এই সময় অতুলপ্রসাদের আত্ময়স্বজনেরা, বিশেষ করে তাঁর মা সব ভুলে গিয়ে সম্পর্ককে উন্নত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই কারণে তাঁর মা লখ্নৌতে আসেন। অতুলপ্রসাদও সব ভুলে গিয়ে সম্পর্ক দৃঢ় করায় আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী হেমকুসুম অতীতের লাঞ্ছনাকে ভুলতে পারেন নি। তাই তিনি কোনো ভাবেই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে মেনে নিতে পারেন নি। ফলে অনিবার্যভাবে পারিবারিক সংঘাত শুরু হয়। ১৯০০ সালে মামাতো বোন হেমকুসুমের সঙ্গে বিয়ের পর অতুলপ্রসাদের মামা স্যার কেজি গুপ্ত ২৫ বছর বেঁচে ছিলেন। কেজি গুপ্তের মৃত্যু হয় ১৯২৬ সালের ২৩ মার্চ। জীবদ্দশায় মামা-ভাগ্নের মধ্যে যোজন দূরত্ব রচিত হলেও শ্রীপুরের সমাধিতে আছেন তারা কাছাকাছি। পাশেই রয়েছে কালীনারায়ণের নিজের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাধিও। গাজীপুরের ইতিহাস গবেষক ড. ফরিদ আহমদের তথ্যমতে, সমাধিতে কারোরই মৃতদেহ নেই, তবে চিতাভস্ম রয়েছে। তাদের কেউ লক্ষ্মৌ, কেউ আবার লন্ডনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। যে যেখানে মারা গেছেন, সেখানেই তাদের চিতা হয়েছে। পরে চিতাভস্ম এনে কাওরাইদে সমাহিত করা হয়েছে।

    ৭.
    কবি, গীতিকার, গায়ক অতুলপ্রসাদ সেন বাল্যকালে পিতৃহীন হয়ে ভগবদ্ভক্ত, সুকণ্ঠ গায়ক ও ভক্তিগীতি রচয়িতা মাতামহ কালীনারায়ণ গুপ্তের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হন। পরবর্তীকালে মাতামহের এসব গুণ তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। দাদু কালীনারায়ণ ভগবদভক্ত, সুকন্ঠ গায়ক ও সহজ ভক্তিসংগীত রচয়িতা হিসেবে খ্যাত ছিলেন; অতুলপ্রসাদ দাদুর এইসব গুণের অধিকারী হয়েছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি যে গান রচনা করেছিলেন (‘তোমারি যতনে তোমারি উদ্যানে’), এখনও সেটি ব্রক্ষ্মসংগীত হিসেবে গাওয়া হয়। নানা কর্মব্যস্ত বেদনাহত জীবনে এই সংগীত রচনাই চিরদিন তাঁর মনের এক প্রধান আশ্রয় ছিল।

    ৮.
    অতুলপ্রসাদ ১৮৯০ সালে প্রবেশিকা পাসের পর কিছুদিন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং কলকাতায় লর্ড সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের জুনিয়র হিসাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তবে এক্ষেত্রে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন দুর্গামোহন দাশ। আইন ব্যবসায় তিনি কলকাতায় ততটা পসার জমাতে পারলেন না। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে দুর্গামোহন দাশ পরলোকগমন করেন। ফলে অতুলপ্রসাদকে সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। আর্থিক সুবিধা লাভের আশায় তিনি রংপুরে চলে যান। পরে লক্ষ্ণৌতে স্থায়িভাবে বসবাস করেন। সেখানে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং আউধ বার অ্যাসোসিয়েশন ও আউধ বার কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন। লক্ষ্ণৌ নগরীর সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। ক্রমে ক্রমে তিন লখ্‌নৌ শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। সেখানে অবশ্য তাঁর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে দ্রুতলয়ে। তিনি ছিলেন সেখানের প্রবাসী বাঙালিদের মুকুটমণি। সারাদিন কাটতো আদালতে, সন্ধ্যাবেলা কাটতো বন্ধুসান্নিধ্যে বা সংগঠনে, কোনো কোনোদিন গানের আসরে। খেতে যেমন ভালবাসতেন খাওয়াতেও ভালবাসতেন। তাঁর জন্য বাবুর্চি ছিল। দৈনন্দিন বিলাসব্যসনেও শারীরিক শ্রমলাঘবে নিয়োজিত থাকত ভৃত্য। কিন্তু সহধর্মিণী থাকতেন না প্রায়শই। এই সময় বাবু গঙ্গাপ্রসাদ ভার্মা লখ্‌নৌ শহরের উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে অতুলপ্রসাদ, লালা শ্রীরাম এবং নবীউল্লাহ বেগ তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। এরপর তিনি বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগারের সংস্কার করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় যুবক সমিতি, গুডউইল ক্লাব ও সেবা সমিতি। শ্রীরমেশ ঘোষের উদ্যোগে ১৮৯৫ সালে লক্ষ্মৌতে মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রথম বাঙালি স্কুল ‘হিন্দু গার্লস কলেজ’ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯০২ সালে তিনি এই স্কুলের সভাপতি হন। অতুলপ্রসাদ প্রবাসী (বর্তমানে নিখিল-ভারত) বঙ্গ-সাহিত্য সম্মিলন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি উক্ত সম্মিলনের মুখপত্র উত্তরার একজন সম্পাদক এবং সম্মিলনের কানপুর ও গোরখপুর অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। রাজনীতিতে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও গোখেলের অনুবর্তী হিসেবে তিনি প্রথমে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে লিবারাল ফেডারেশন বা উদারনৈতিক সংঘভুক্ত হন ও এর বার্ষিক সম্মিলনে সহ-সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। অতুলপ্রসাদ তাঁর সমগ্র জীবনের উপার্জিত অর্থের বৃহদংশ স্থানীয় জনকল্যাণে ব্যয় করেন; তাঁর উপার্জনের একটা বড় অংশ জীবিতকালেই লোকসেবায় ব্যয় করেছিলেন; অবশিষ্ট সম্পত্তির বেশির ভাগই, তাঁর আসবাব-গৃহ এবং গ্রন্থস্বত্বও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দান করে গেছেন।

    ৯.
    অন্তর্মুখী এবং ভগবতমুখী গীতিরচয়িতা অতুলপ্রসাদ বাইরের জীবনে নিজের প্রতিভার চিহ্ন নানা ভাবে রেখে গেছেন। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে যে সব বাঙালি বিভিন্ন প্রদেশকে নিজের কর্মভূমি বলে স্বীকার করে জনসেবার মাধ্যমে সেই সব জায়গায় অধিবাসীদের ঐকান্তিক শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন, অতুলপ্রসাদ সেনের নাম তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। প্রবাসী বঙ্গ-সাহিত্য-সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষক হয়েও, চিরিদিন বাংলা ভাষার সেবা ও জন্মভূমির স্মৃতি অন্তরে বহন করেও, অন্য প্রদেশে তিনি নিজেকে কখনো প্রবাসী বলে মনে করেননি- “নিজেদের প্রবাসী বলতে আমি সংকোচ বোধ করি। ভারতে বাস করে ভারতবাসী নিজেকে পরবাসী কি করে বলবে?… এ দেশও আমাদের দেশ”। আর এই দেশের কল্যাণকর্মে তিনি শ্রম, অর্থ ও প্রীতি অকুণ্ঠ ভাবে নিয়োগ করেছিলেন। যুক্তপ্রদেশ, বিশেষতঃ লক্ষ্ণৌ নগরীর সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি তিনি সম্পূর্ণ একাত্ম হয়েছিলেন; লক্ষ্ণৌ শহরের যে রাজপথের পাশে তাঁর বাড়ি ছিল, তাঁর জীবিতকালেই তাঁর নামে সেই রাজপথ সরকারি ভাবে চিহ্নিত হয়েছিল; দীনদুঃখীকে উদার হাতে দান করে, সার্বজনিক নানা প্রতিষ্ঠানের কর্মভার নিয়ে তিনি সর্বধারণের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধার আসন লাভ করেছিলেন- মৃত্যুর পর তাঁর গুণানুরাগীগণ লক্ষ্ণৌ শহরে তাঁর মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তিনি বিশেষ ভাবে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তাঁর স্মরণে একটি ‘হল’ চিহ্নিত হয়েছে।

    ১০.
    ১৯০২ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত অতুলপ্রসাদ আইন ব্যবসা উপলক্ষে লক্ষ্ণৌতে অতিবাহিত করেন। সে সময় তাঁর বাংলোতে প্রায় সন্ধ্যায়ই গানের আসর বসত। সে আসরে গান শোনাতে আসতেন আহম্মদ খলিফ খাঁ, ছোটে মুন্নে খাঁ, বরকৎ আলী খাঁ এবং আব্দুল করিমের মতো বিখ্যাত ওস্তাদগণ। ভালো সঙ্গীতের আসর পেলে তিনি আদালত ও মক্কেলের কথা ভুলে যেতেন। অতুলপ্রসাদ অধিকাংশ গান লক্ষ্ণৌতেই রচনা করেন। তাঁর গানের সংখ্যা মাত্র ২০৬ এবং সেসবের মধ্যে মাত্র ৫০-৬০টি গান গীত হয়। আইনজীবী হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গান শুনে তিনি নিজের একাকীত্ব ঘুচাতে চেষ্টা করতেন। গাওয়ার চাইতে শুনতে ভালবাসতেন। হয়ত এজন্যই তার গানের সংখ্যা এত কম। অতুলপ্রসাদের মামাতো বোন সাহানা দেবীর সম্পাদনায় ৭১টি গান স্বরলিপিসহ কাকলি (১৯৩০) নামে দু খন্ডে প্রকাশিত হয়। তাঁর অপর গানগুলিও গীতিপুঞ্জ এবং কয়েকটি গান নামে দুটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। ১৯২২-২৩ সালের দিকে কলকাতা থেকে প্রথম অতুলপ্রসাদের গানের রেকর্ড বের হয় সাহানা দেবী ও হরেন চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। পরে যেসব শিল্পী তাঁর গান গেয়েছেন তাঁরা সুর-তালের ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন করায় তা নিয়ে কিছুটা বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়। অতুলপ্রসাদের গীতিসংকলন প্রকাশিত হয় ‘গীতিগুঞ্জে’ এবং গানগুলোর স্বরলিপি প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে নীহারবন্ধু সেনের সম্পাদনায় ‘কাকলি’ নামক গ্রন্থে। স্বরলিপিকৃত ১২০টি গানের মধ্যে কীর্তনভঙ্গিম গানের সংখ্যা-১৫টি, বাউল অঙ্গের গান-১৭টি, প্রসাদী সরের গান-২টি, বাউল-কীর্তনের সমন্বিত সুরে গান-৩টি, গজল অঙ্গের গান-৭টি, বিষয়ভিত্তিক গান-১০টি এবং বাকিগুলো তাঁর একান্তই ব্যক্তি জীবনসংশ্লিষ্ট পাঁচমিশালী ধরনের। তবে ঘুরে ফিরে ১৫-২০টি গানই শিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যায়। উল্লেখ্য, কাকলিতে অন্তর্ভুক্ত গানগুলোর স্বরলিপি তিনি নিজে বা তাঁর তত্ত্বাবধানে হয়নি। গ্রন্থটির ভূমিকায় অতুলপ্রসাদ লিখেছেন : ‘আমি নিজে স্বরলিপি জানি না, তাই আমার ভাই মন্টু (অর্থাৎ শ্রীমান দিলীপ কুমার রায়) স্বরলিপি ছাপাবার ও আমার বোন ঝুনু (অর্থাৎ শ্রীমতি সাহানা দেবী) আমার গানের স্বরলিপি করার ভার নিয়েছেন। তাঁদের আগ্রহ ও সহায়তা না পেলে আমার গানগুলো মূক হয়েই থাকত, কাকলি শ্রবণগোচর হতো না’ (উদ্ধৃতি; বাংলা গানের সন্ধানে, সুধীর চক্রবর্তী, অরুণা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা-১৬৩)। উল্লেখ্য, ‘কাকলি’ প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড প্রথম বেরোয় দিলীপ কুমার রায়ের তত্ত্বাবধানে সাহানা দেবীর সম্পাদনায় এবং বেশিরভাগ গানের স্বরলিপি করেন তারা দু’জনে। স্বরলিপির কাজে অতুলপ্রসাদ নিজে সম্পৃক্ত ছিলেন না বিধায় স্বাভাবিক কারণেই গানগুলোর অনেকটা স্বাদ ও নিজস্বতা হারিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: “অতুলপ্রসাদের যেসব গানের কোনো প্রামাণ্য সুর পাওয়া যায়নি সে-সব গান শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় মুদ্রিত হয়েই শেষ হয়ে গিয়েছে, তাতে যদি নবতর সুর সংযোজনা করে পুনর্জীবিত করা যায় এবং তা যদি রসোত্তীর্ণ হয়থ যদি তাতে অতুলপ্রসাদের গানের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে এবং সঙ্গীত রসিক সমাজ তা যদি গ্রহণ করে তাতে আপত্তি করার কিছু নেই একমাত্র গোড়ামি ছাড়া। বিচারের ভার ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত … (দ্রষ্টব্য : আমার সঙ্গীত ও আনুষঙ্গিক জীবন, পৃষ্ঠা-৪৭ ও ৪৮)।”

    ১১.
    বাংলা সঙ্গীতে অতুলপ্রসাদই প্রথম ঠুংরির চাল সংযোজন করেন। এ ছাড়া রাগপ্রধান ঢঙে বাংলা গান রচনা তাঁর থেকেই শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, বাংলায় ঠুংরি গীতধারার প্রথম প্রচলন করেন লক্ষ্ণৌর বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্। অতুলপ্রসাদের বিশেষত্ব এই যে, তিনি বাংলা গানের সুর-তালের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখেই হিন্দুস্থানি রীতির প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় তিনি উত্তর ভারতে কাটান। সেজন্য ওখানকার সাঙ্গীতিক পরিমন্ডলের সঙ্গে মিশে গিয়ে তিনি হিন্দুস্থানি গীতিপদ্ধতিকে রপ্ত করতে সমর্থ হন। তাই বাংলা গানে হিন্দুস্থানি ঢঙের মিশ্রণ ঘটানো তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল। অতুলপ্রসাদের এই প্রয়াস বাংলা গানে একদিকে যেমন নতুনত্ব এনেছে, অন্যদিকে তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথ উন্মুক্ত করে বাংলা গানের জগতে এক বন্ধনমুক্ত শৈল্পিক আবহ নির্মাণে সক্ষম হয়েছে। হিন্দুস্থানি লঘু খেয়াল, ঠুংরি ও দাদরা সঙ্গীতের সুষমামন্ডিত সুরের সঙ্গে অতুলপ্রসাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। হিন্দুস্থানি সুর সংযোজনায় বাংলা গানের কাব্যিক মর্যাদা কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করলেও একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাঙ্গীতিক ভাব তাঁর সকল গানে পরিলক্ষিত হয়। যেখানে সুর সঙ্গীতের অন্তর্নিহিত মাধুর্য নিয়ে কথার ভাবকে ছাড়িয়ে গিয়েছে সেখানেই অতুলপ্রসাদের সার্থকতা। তাঁর ঠুংরি ও দাদরা ভঙ্গির গানগুলি শৈল্পিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। এমন কয়েকটি গান হলো: ‘কি আর চাহিব বলো’ (ভৈরবী/টপ খেয়াল), ‘ওগো নিঠুর দরদী’ (মিশ্র আশাবরী-দাদরা/টপ ঠুংরি), ‘যাব না যাব না ঘরে’ (ঠুংরি) ইত্যাদি। তাঁর রাগপ্রধান গানের মধ্যে ‘বঁধু ধর ধর মালা’ (কালিংড়া), ‘তবু তোমায় ডাকি বারে বারে’ (সিন্ধু কাফি) ইত্যাদি গান আজও সঙ্গীতবোদ্ধাদের নিকট সমান প্রিয়। অতুলপ্রসাদ রাগপ্রধান ঢঙে বাংলা গানে যে সুর সংযোজন শুরু করেন, তা পরে একটি শক্তিশালী ধারা হিসেবে বিকশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামের গান এবং রাগপ্রধান অঙ্গের অন্যান্য আধুনিক গান এভাবে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে গড়ে ওঠে।

    ১২.
    অতুলপ্রসাদের অপর কৃতিত্ব ধ্রুপদ ও কীর্তনের সুরসমন্বয়ে সঙ্গীত রচনা, যেমন ‘জানি জানি হে রঙ্গ রানী’ (তিলক প্রমোদ)। তাঁর গানে খাম্বাজরাগের বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এ ছাড়াও নটমল্লার, নায়কী কানাড়া, কাফি, পিলু প্রভৃতি রাগের মিশ্রণেও তিনি গান রচনা করেছেন। অতুলপ্রসাদের কীর্তন, বাউল এবং রবীন্দ্র আঙ্গিকে রচিত স্বদেশী গানগুলি বাংলা সঙ্গীতের জগতে মর্যাদাপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, যেমন: ‘হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর’, ‘উঠ গো ভারত লক্ষ্মী’ ইত্যাদি। ছোটবেলায় ঢাকা ও ফরিদপুরে বাউল, কীর্তন ও মাঝি-মাল্লাদের ভাটিয়ালি গানের মূর্ছনা অতুলপ্রসাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছিল। সে সুরের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত তাঁর বাউল ও কীর্তন ঢঙের গানগুলিতে বাংলার প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌয়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে স্বেচ্ছাসেবকদের অধিনায়ক হিসেবে তিনি যে দেশাত্মবোধক গানটি রচনা করেন, তাতে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের সুর আছে: ‘দেখ মা এবার দুয়ার খুলে/ গলে গলে এল মা/ তোর হিন্দু-মুসলমান দু ছেলে’। অতুলপ্রসাদ প্রেম, ভক্তি, ভাষাপ্রীতি, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক বহু গান রচনা করেছেন। আবার বাণীপ্রধান গীতি রচনা, সুললিত সুর সংযোজন, সুরারোপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রচলন ও করুণরস সঞ্চারের মাধ্যমে অতুলপ্রসাদ বাংলা সঙ্গীতভান্ডারকেও ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।

    ১৩.
    একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বাংলা সঙ্গীতের সার্বিক উন্নয়নে ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাংলা গানকে বিধিবদ্ধভাবে একটা শক্ত কাঠামোয় দাঁড় করানোর মতো মহৎ কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার কিছু সংখ্যক কর্মী পুরুষের হাতে। নতুন নতুন ভাবনার আলোকে তখন বাঙালির চিত্ত গীতসুধার জন্য পিপাসিত ছিল বিধায় সঙ্গীতস্রষ্টারাও সৃষ্টি করেছিলেন সমকালীন শ্রোতাদের চাহিদামাফিক বিভিন্ন ধরনের বাংলা গান, যেগুলো আমাদের সবচেয়ে স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। তখনকার অবিস্মরণীয় সঙ্গীতস্রষ্টাদের মধ্যে বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম প্রদীপ অতুলপ্রসাদ সেনের নামটি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। রবীন্দ্র-নজরুল এর মতো তিনি প্রচুর গান কিংবা পৃথক গায়নশৈলী সৃষ্টি করতে পারেননি, কিন্তু একজন সঙ্গীতস্রষ্টা হিসেবে সমকালীন শ্রোতাদের প্রচুর প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন যেগুলো আজও আমাদেরকে নিরন্তর কাছে টানে। গানে গানে তিনি উদঘাটন করতে চেয়েছিলেন তাঁর স্বকীয় সত্তাকে। হয়ত নিজের কথা ও সুরের মাঝে তিনি তাঁর বাষ্পাকুল জীবনকেই প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্র-নজরুলের মতো উৎসব, অনুষ্ঠান, আনন্দ, উৎসাহ ও উদ্দীপনায় গানের ভিত্তি তৈরি করার মানসিকতা তাঁর ছিল না, সেক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একেবারেই উদাসীন।দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কালের চক্রে অতুলপ্রসাদের নাম ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ তাঁর জীবনবৃত্তান্ত সহজলভ্য নয়, গানের চর্চায়ও আমাদের নিদারুণ অবহেলা।

    ১৪.
    কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথে অতুল প্রসাদের গভীর সুসম্পর্ক বজায় ছিলো। আর তাই অতুলপ্রসাদ সেন- এর উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতাটি পাঠ করা যেতেই পারে। –
    ‘বন্ধু, তুমি বন্ধুতার অজস্র অমৃতে
    পূর্ণপাত্র এনেছিলে মর্ত্য ধরণীতে।
    ছিল তব অবিরত
    হৃদয়ের সদাব্রত,
    বঞ্চিত কর নি কভু কারে
    তোমার উদার মুক্ত দ্বারে।
    মৈত্রী তব সমুচ্ছল ছিল গানে গানে
    অমরাবতীর সেই সুধাঝরা দানে।
    সুরে-ভরা সঙ্গ তব
    বারে বারে নব নব
    মাধুরীর আতিথ্য বিলাল,
    রসতৈলে জ্বেলেছিল আলো।
    দিন পরে গেছে দিন, মাস পরে মাস,
    তোমা হতে দূরে ছিল আমার আবাস।
    “হবে হবে, দেখা হবে’ —
    এ কথা নীরব রবে
    ধ্বনিত হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে
    অকথিত তব আমন্ত্রণে।
    আমারো যাবার কাল এল শেষে আজি,
    “হবে হবে, দেখা হবে’ মনে ওঠে বাজি।
    সেখানেও হাসিমুখে
    বাহু মেলি লবে বুকে
    নবজ্যোতিদীপ্ত অনুরাগে,
    সেই ছবি মনে-মনে জাগে।
    এখানে গোপন চোর ধরার ধুলায়
    করে সে বিষম চুরি যখন ভুলায়।
    যদি ব্যথাহীন কাল
    বিনাশের ফেলে জাল,
    বিরহের স্মৃতি লয় হরি,
    সব চেয়ে সে ক্ষতিরে ডরি।
    তাই বলি, দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ,
    বিচ্ছেদের তাপ নাশে সেই বড়ো তাপ।
    অনেক হারাতে হয়,
    তারেও করি নে ভয়;
    যতদিন ব্যথা রহে বাকি,
    তার বেশি যেন নাহি থাকি।’ ( শান্তিনিকেতন, ১৯ ভাদ্র, ১৩৪১)

    ১৫.১
    অতুলপ্রসাদ সেনের লেখা আমার প্রিয় কয়েকটি গানের বাণী তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না :
    ‘কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে?
    হৃদি মোর উঠল কাঁপি’ চরণের সেই রণনে।।
    কোয়েলা ডাকল আবার, যমুনায় লাগল জোয়ার;
    কে তুমি আনিলে জল ভরি’ মোর দুই নয়নে।।
    আজি মোর শূন্য ডালা, কী দিয়ে গাঁথব মালা?
    কেন এই নিঠুর খেলা খেলিলে আমার সনে।।
    হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি’-
    ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে।।’

    ১৫.২
    ‘আজ আমার শূন্য ঘরে আসিল সুন্দর,
    ওগো অনেক দিনের পর।
    আজ আমার সোনার বধূ এল আপন ঘর,
    ওগো অনেক দিনের পর।।
    আজ আমার নাই কিছু কালো,
    পেয়ে আজ উজল মণি
    সব হলো আলো।
    আজ আমার নাইকো কেহ পর,
    সুখীরে করেছি সখা, দুঃখীরে দোসর
    ওগো অনেক দিনের পর।।
    মনে পড়িল তাকি?
    এতদিন যে দুয়ার খুলে ছিনু একাকি।
    বুঝি ভিজিল আঁখি।
    আর ছেড়ে যেয়ো না বধূ জন্মজন্মান্তর,
    ওগো আমার সুন্দর।’

    ১৫.৩
    ‘বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে।
    আমিও একাকী, তুমিও একাকী আজি এ বাদল রাতে।।
    ডাকিছে দাদুরী মিলনতিয়াসে ঝিল্লি ডাকিছে উল্লাসে।
    পল্লীর বধু বিরহী বঁধুরে মধুর মিলনে সম্ভাষে।
    আমারো যে সাধ বরষার রাত কাটাই নাথের সাথে।।
    গগনে বাদল, নয়নে বাদল জীবনে বাদল ছাইয়া;
    এসো হে আমার বাদলের বঁধু, চাতকিনী আছে চাহিয়া।
    কাঁদিছে রজনী তোমার লাগিয়া, সজনী তোমার জাগিয়া।
    কোন্ অভিমানে হে নিঠুর নাথ, এখনও আমারে ত্যাগিয়া?
    এ জীব- ভার হয়েছে অবহ, সঁপিব তোমার হাতে।’

    ১৫.৪
    নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন,
    তুই সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন
    মূঢ় মন, সুখি জনের করিস পূজা, দুঃখীর অযতন।।
    লাগে নি যার পায়ে ধুলি, কি নিবি তার চরণ ধুলি,
    নয়রে সোনায়, বনের কাঠেই হয় রে চন্দন।।
    প্রেমধন মায়ের মতন, দুখ কি সুতেই অধিক যতন,
    এ ধনেতে ধনি যে জন, সেই তো মহাজন।
    মূঢ় মন, সেই তো মহাজন।।
    বৃথা তোর কৃচ্ছসাধন, সেবাই নরের শ্রেষ্ঠ সাধন,
    মানবের পরম তীর্থ দীনের শ্রীচরণ।
    মূঢ় মন, দীনের শ্রীচরণ।
    মতামতের তর্কে মত্ত, আছিস ভুলে পরম সত্য,
    সকল ঘরে সকল নরে আছেন নারায়ণ
    মূঢ় মন, আছেন নারায়ণ
    নীচুর কাছে নীচু হতে শিখলি না রে মন।।

    ১৫.৫
    ‘একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলাম নয়ন-জলে।
    সহসা কে এলে গো এ তরী বাইবে ব’লে
    যা ছিল কল্পমায়া, সে কি আজ ধরল কায়া?
    কে আমার বিফল মালা পরিয়ে দিল তোমার গলে।
    কেন মোর গানের ভেলায় এলে না প্রভাত-বেলায়?
    হলে না সুখের সাথী জীবনের প্রথম দোলায়।
    বুঝি মোর করুণ গানে ব্যাথা তাঁর বাজল প্রাণে,
    এলে কি দু’কুল হতে কূল মেলাতে এ অকূলে।’

    ১৫.৬
    বঁধু এমন বাদলে তুমি কোথা?
    আজি পড়িছে মনে মম কত কথা।
    গিয়াছে রবি শশী গগন ছাড়ি,
    বরষে বরষা বিরহ-বারি;
    আজিকে মন চায় জানাতে তোমায়
    হৃদয়ে হৃদয়ে শত ব্যথা।
    দমকে দামিনী বিকট হাসে;
    গরজে ঘন ঘন, মরি যে ত্রাসে।
    এমন দিনে হায়, ভয় নিবারি,
    কাহার বাহু ‘পরে রাখি মাথা।।

Share This Article
Jobs By Category
Recent Jobs
Question Bank