মেধা বনাম চেষ্টা

সাফল্যের জন্য মেধা ও চেষ্টা—দুটোরই প্রয়োজন। মেধা বলতে আমরা কী বুঝি? অনেকে মেধা বলতে মস্তিষ্ক বোঝাতে চান। তাঁদের ধারণা, আমাদের মেধা মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করে এবং এটা বংশানুক্রমিক বা জন্মসূত্রে পাওয়া। আমরা জানি, আমাদের সব কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। মন-মানসিকতার সঙ্গে মস্তিষ্কের সরাসরি সম্পর্ক আছে। আমরা এটাও জানি যে মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। সহজ করে বলার জন্য, এই লেখায় আমি মস্তিষ্ক ও মনকে সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করব এবং মেধা বলতে আমি জৈবিক মস্তিষ্কের বদলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপকে বোঝাব।

জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে আপনার কাঙ্ক্ষিত সফলতা লাভের উদ্দেশ্যে, আপনি একটি সুস্থ মস্তিষ্কের শারীরিক দিকগুলো উপেক্ষা করতে পারেন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো আপনি কীভাবে আপনার মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দেন এবং কীভাবে এর ব্যবহার করেন। আপনি যদি বেশি সময় ধরে ঘরে বসে থাকেন এবং হাঁটাহাঁটিসহ অন্য শারীরিক কার্যকলাপ কমিয়ে দেন, আপনার শরীরে ধীরে ধীরে জড়তা আসবে এবং আপনার হাঁটতে কষ্ট হবে। তেমনি আমাদের মস্তিষ্ককে যদি অলস করে রাখা হয়, তাহলে মস্তিষ্কেও জড়তা ধরবে। মস্তিষ্ক খুবই স্থিতিশীল এবং প্রশিক্ষণ নেওয়ার অপরিসীম ক্ষমতা এর আছে। আমাদের মস্তিষ্কের এই জৈবিক উপহারকে ভালো কাজে ব্যবহার করতে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চয়ই জানেন, যত বেশি মুখস্থ করবেন, তত বেশি আপনার মনে থাকবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের জ্ঞানের ভিত্তি বিস্ফোরিত হয়ে এমন স্থানে পৌঁছেছে, সবকিছু মুখস্থ করে মাথায় রাখা একেবারেই সম্ভব নয়। আমাদের জন্মের সময় মস্তিষ্ক তাজা এবং প্রায় ফাঁকা থাকে। ধীরে ধীরে আমরা মস্তিষ্ককে নড়াচড়া করা, দেখা ও কথার বলার প্রশিক্ষণ দিই। তারপর যখন পড়াশোনার পালা শুরু হয়, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। শিক্ষার এই প্রাথমিক পর্যায়ে, স্মৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং মুখস্থ করে শেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। মুখস্থবিদ্যার গুরুতর সীমাবদ্ধতা আছে। মুখস্থ করে অর্জিত তথ্য বা জ্ঞানকে সাধারণভাবে ব্যবহার করা কঠিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ।

বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য শেখার একটি ভিন্ন পদ্ধতিতে যেতে হবে। তখন মুখস্থ করা চেয়ে জ্ঞান কাঠামো উপলব্ধি করাই হবে মুখ্য। ফলে ধীরে ধীরে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে সমালোচনামূলক চিন্তা করার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের সমাজে সমালোচনা করার প্রবণতা এত বেশি, তাই এই প্রসঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তা বলতে আমি কী বোঝাচ্ছি, তা একটু বলা প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা মানে অন্যের সমালোচনা করা নয়, বরং নিজের চিন্তাশক্তিকে যাচাই করা এবং একটা বিষয় বিভিন্ন দিক থেকে ভাবা।

একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে উদাহরণ দিই। আমার পরিচিত এক বয়স্ক ভদ্রলোক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের ঠিক পরপরই মার্কিন বাহিনীর একজন তরুণ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে টোকিওতে নিযুক্ত হয়েছিলেন। যুদ্ধের আগে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং একটি সুপরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। যুদ্ধের কারণে একটি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেছিলেন। একদিন টোকিওর একটি শহরতলিতে স্থানীয় দুই দুষ্কৃতকারী দলের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তাঁর ওপর নির্দেশ ছিল, এই লড়াই সামাল দিতে হবে। তিনি তাঁর সৈনিকদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এলাকা থেকে বের হওয়ার রাস্তা ঘিরে ফেলেন। কয়েক ঘণ্টা বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির পর একটি দল যখন পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি ধাওয়া করে দলের শীর্ষ নেতাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে ফেলেন। এ জন্য সাহসিকতার পদকও পান। সেই পদকটি তিনি গর্ব ভরে দেখান। পিস্তলের গুলি দিয়ে এই পদক লাভ করেছেন সে জন্য নয়; কারণ, তাঁর শক্তি ছিল মস্তিষ্কের বুদ্ধি। অস্ত্রবলে পরিস্থিতি দমন করার ক্ষমতা তাঁর হাতে ছিল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেটা বৈধও হতো। কিন্তু তিনি অকারণ প্রাণনাশের ঝুঁকি না নিয়েই একটা গুরুতর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি তাঁর সমালোচনামূলক চিন্তাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন।

সাফল্য অর্জনের জন্য মেধার অনুশীলন প্রয়োজন তো বটেই, কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। সাফল্য অর্জন নিশ্চিত করতে হলে অদম্য প্রচেষ্টা অপরিহার্য। ছোটবেলায় কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের কবিতা পড়েছিলাম, ‘পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার… একবার না পারিলে দেখো শতবার।’ এই সরল কিন্তু ভীষণ উপযোগী কথা অনুসরণ করলেই প্রচেষ্টা অদম্য হবে। কাজ যত ছোটই হোক না কেন, অদম্য প্রচেষ্টা থাকলে ছোট কাজও সুন্দরভাবে করা যায়।

আমেরিকান স্পেশাল ফোর্সের সাবেক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ম্যাকরেভেন তাঁর মেক ইওর বেড বইতে একটি সাফল্য অর্জন দিয়ে প্রতিটা দিন শুরু করার উপদেশ দিয়েছেন। তাতে আপনার মনোবল বাড়বে এবং আপনি পরে অন্য কোনো কাজও সফলভাবে করার প্রেরণা খুঁজে পাবেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বিছানা গোছানোর কথা বলেছেন। এটা কোনো কঠিন কাজ নয়, খুব বেশি সময়ের প্রয়োজনও নেই। সারা দিন যদি আপনি একের পর এক ছোট ছোট অনেক কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করেন, শুধু কাজ সম্পন্ন হবে তা নয়, সুচারুভাবে কাজ করা আপনার অভ্যাসে পরিণত হবে। এই সুন্দর অভ্যাস একটা অসাধারণ গুণে রূপান্তর হবে। ফলে কাজ ছোট-বড় যা-ই হোক, আপনি স্বভাবতই পূর্ণ উদ্যম নিয়ে কাজটা সম্পন্ন করবেন। মন তৃপ্তি পাবে, বড় মহতী কাজ করার সুযোগ উন্মুক্ত হবে এবং জীবনে সাফল্যও আসবে।

আমি নিজে এই পথ ধরেই পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা এবং পরবর্তীকালে উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছি। যদিও লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিলাম, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিতে পাস করলেও শীর্ষ দশের তালিকায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি। তাই দেশের প্রচলিত মান হিসেবে আমি নিজেকে কখনো মেধাবী ভাবিনি। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, চেষ্টার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে পারব। তাই জীবনে যখনই বাধার সম্মুখীন হয়েছি বা পিছিয়ে পড়েছি, কখনো মনোবল হারাইনি। নতুন সংকল্প নিয়ে আরও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে লক্ষ্যগুলো অনুসরণ করেছি এবং অবশেষে সফলতা লাভ করেছি। কাজেই আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, আমাদের সবার মস্তিষ্কের অনেক কিছু শেখার, জানার এবং করার ক্ষমতা আছে। মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দিয়েই মেধার বিকাশ করতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন চেষ্টা। চেষ্টা না থাকলে মেধা অর্থহীন।

আপনাদের যাঁর যা লক্ষ্য, উদ্যম ধরে রেখে চেষ্টা চালিয়ে যান—নিজের সাফল্যে নিজেই অবাক হবেন। রাঙামাটি উচ্চবিদ্যালয় বা ঢাকা কলেজে যখন ছাত্র ছিলাম, নানা উচ্চাকাঙ্ক্ষা মনে বিচরণ করত, উদ্যম আর চেষ্টার অভাব কখনো ছিল না। তখন কখনোই ভাবিনি আমি দুটি বড় পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হব। এই সাফল্যের অন্যতম উপকরণ—চেষ্টা। চেষ্টা ছাড়াও আরও কিছু গুণের চর্চা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে সেসব নিয়ে লিখব।

অমিত চাকমা :  উপাচার্য, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

Share This Article
Jobs By Category
Recent Jobs
Question Bank